বিশ্বের সকল সাক্ষাৎই দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর পুনর্মিলন—সিনিয়র শিক্ষার্থী সম্পর্কে
আজ বইটি এক লক্ষ শব্দে পৌঁছেছে। আমি দেখেছি, প্রতিদিনই তোমাদের কারও না কারও সঙ্গে আমার কথোপকথন হয়, এটি আমার জীবনে এক অনন্য সুখের মুহূর্ত। আমি তোমাদের বলতে চাই, এই পথচলায় পাশে থাকার জন্য আমি অপরিসীম আনন্দিত। পাশে থাকা মানেই হচ্ছে সবচেয়ে গভীর ভালোবাসার প্রকাশ, আর অপেক্ষারত স্মৃতিচারণা হচ্ছে সবচেয়ে অসহায় প্রতীক্ষা।
অনেক পাঠক আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, সেই আপু কি বাস্তব, সে কি সত্যিই আমার সঙ্গে ছিল। আজও মনে পড়ে, দুই মাস আগে গভীর রাতে ইন্টারনেটে হঠাৎ একটি ছোট গল্প পড়েছিলাম, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আপুর কথা ছিল। গল্পটি ছিল সাধারণ, কিন্তু তাতে আমার তিন বছরের স্তব্ধ স্মৃতিবেদনা হঠাৎ যেন উথলে উঠেছিল। তখনই সিদ্ধান্ত নিই, এই আপুকে নিয়ে লিখব আমার নিজের গল্প।
হ্যাঁ, এই আপু আমার হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে থাকা সেই মানুষের ছায়া। সে একদিন বলেছিল, পৃথিবীর প্রতিটি দেখা-সাক্ষাৎই হচ্ছে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পরে পুনর্মিলন। ওটাই ছিল তার প্রিয় উক্তি, তার ব্যক্তিত্বের এক চিহ্ন। আমি সবসময় মনে করতাম, আমাদের দেখা যেন এক নতুন সাক্ষাৎ, আর এই পুনর্মিলন চিরস্থায়ী হবে।
কিন্তু আমি ভুলে গিয়েছিলাম, দীর্ঘ বিচ্ছেদের পরেই কেবল পুনর্মিলন সম্ভব। দুঃখের বিষয়, আমাদের সেই বিদায় তিন বছর ধরে চলেছে, আর পুনর্মিলনের শুরুই হয়নি। আমরা কেউই জানি না, কখন কারও একটি বিদায়ের কথা সত্যিই চিরতরে বিদায় হয়ে যায়। আমি তাকে কোথাও খুঁজে পাইনি, তাই আমার স্মৃতিচারণা গল্পের পাতায় তুলে দিয়েছি।
পরশু রাতে, পাঠকবন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে তারা আবার জানতে চাইল, গল্পের আপু কি বাস্তবের আপুর মতোই। আমি বললাম, যতবারই আমি তার হাত ধরতে চেয়েছি, ও সবসময় রাগ করে হাত ছাড়িয়ে নিত, কিন্তু অসুস্থ হলে আবার সেই হাত আঁকড়ে ধরত খুব শক্ত করে। এই কথাটা বলার সময় আমার চোখ ভিজে উঠেছিল। স্মৃতিচারণা বড় বিষাদের ব্যাপার, অথচ বইতে আমি সবসময় হাস্যরসের ছলে লিখি। জীবনের তো অনেক অপূর্ণতা থেকেই যায়, কিন্তু বইয়ের পাতায় আমি চেয়েছি এক পরিপূর্ণ সমাপ্তি।
আমি ভয় পাই, এই গল্পটা হয়তো শেষ করা যাবে না, যেমন ভয় পাই, আদৌ কোনোদিন তাকে খুঁজে পাব কি না। এই ক’দিনে তোমরা যারা হীরক ও সুপারিশ দিয়েছ, আমি কৃতজ্ঞ। আমি জানি, তোমরা সবাই আমার ও আপুর পরিণতি জানতে চাও। যতদিন বইটি বেঁচে থাকবে, আমি এই গল্প বলে যাব।
এখনও আমার মানিব্যাগে ভাঁজ করা এক টুকরো কাগজ আছে, সেখানে আমি একবার আপুকে উদ্দেশ্য করে একটি কবিতা লিখেছিলাম—
আমি ডুবে আছি এই সংসারে, কে-ই বা আমায় বোঝে,
ভালোবাসা, অভিমান, বিরহ—তিন জন্মের ঋণ।
বইয়ের পাতায় বাজে সুর, হাতে ওঠে সুরের ছন্দ,
রাতের নিস্তব্ধতায় বাজে সঙ্গীত, ঘুম আসে না আর।
আপু, তুমি তো বলেছিলে, পৃথিবীর প্রতিটি সাক্ষাৎই দীর্ঘ বিচ্ছেদের পরে পুনর্মিলন। তবে কি তোমার চলে যাওয়া ছিল সেই পুনর্মিলনের জন্যই?
তিন বছর পর আজ বুঝি, তুমি ঠিক সময়ে ফিরে আসোনি, আর সেটাই এই বিদায়ের আসল অর্থ।