ত্রিয়াত্তরতম অধ্যায়: নত মস্তকে আনুগত্য স্বীকার

গ্রীষ্মের বিস্তীর্ণ প্রান্তর সবই বোকামি 3082শব্দ 2026-03-19 02:43:44

সবাই একে একে উঠে দাঁড়াল, গ্লাস তোলে শুভেচ্ছা জানাল—শুভ জন্মদিন, শু ঝি শিয়া।
শু ঝি শিয়া ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে এল, তাড়াতাড়ি হাঁসের রান নামিয়ে রেখে কোলার গ্লাস হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল, সবার সঙ্গে গ্লাস ছুঁইয়ে বারবার বলল, ‘‘ধন্যবাদ... ধন্যবাদ... ধন্যবাদ...’’
ঠিক তখনই গাড়ি সারাইয়ের দোকানে একটা বিকল গাড়ি এসে থামল।
শাও ইয়ো উঠে দাঁড়াল, ‘‘তোমরা খেতে থাকো, আমি দেখে আসি!’’
শু ঝি শিয়া হাঁসের রান তুলে কামড়াতে কামড়াতে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল।
বিকেলের আকাশে মেঘগুলো অপূর্ব লাগছিল।
শাও ইয়ো পরে আছে একটা টাইট কার্গো প্যান্ট, ওপরে ঢিলেঢালা স্লিভলেস একটি জামা, লম্বা, সুঠাম, চওড়া কাঁধ, বলিষ্ঠ বাহু।
ক্লায়েন্টের সঙ্গে দু-এক কথা বলে, দক্ষ হাতে ইঞ্জিনের ঢাকনা তোলে, নুইয়ে গিয়ে পরীক্ষা করতে থাকে।
কিছুক্ষণ পরই সে সোজা হয়ে দাঁড়ায়, ঘাড় ঘুরিয়ে ডাকে, ‘‘শিয়াও শিয়াও!’’
উ শিয়াও শিয়াও ‘‘হ্যাঁ’’ বলে সঙ্গেসঙ্গেই থালা-বাসন রেখে দৌড়ে যায়।
শাও ইয়ো একদিকে নির্দেশ করে বলে, ‘‘তুমি খাওয়া শেষ করে এগুলো সব খুলে দেখো তো।’’
উ শিয়াও শিয়াও-এর উচ্চতা শাও ইয়োর নাক পর্যন্ত হবে, পরে আছে ক্যাজুয়াল প্যান্ট, ওপরে গাঢ় ধূসর টি-শার্ট, কোমরের ডান পাশে গিট্টু মারা।
সে সেই চটপটে, স্বাস্থ্যবান রকমের নারী সৌন্দর্যের অধিকারিণী।
শাও ইয়োর পাশে দাঁড়িয়ে বেশ মানিয়েছে।
শু ঝি শিয়ার ভেতরটা হালকা টক-মিষ্টি কষ্টে ভরে যায়, সে চোখ ফেরায়, আর দেখে না।
উ শিয়াও শিয়াও জলদি ফিরে এসে আবার খেতে বসে পড়ে।
সে খুবই প্রাণবন্ত, টেবিলের যেকোনও মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে যেতে পারে।
শাও ইয়ো হাত-মুখ ধুয়ে ফিরে আসে, বাহুতে জলবিন্দু ঝলমল করছে।
সে দেখে শু ঝি শিয়া হাঁসের রান শেষ করেছে, ওর প্লেটে দুটো মাছের টুকরো তুলে দেয়।
এই দোকানের মাছটা খুব ভালো, শাও ইয়ো সকালে গিয়ে অর্ডার দিয়েছিল।
উ শিয়াও শিয়াও দূর থেকে উভয়ের দিকে একবার তাকায়।
একটু দূরত্ব রেখে সে শু ঝি শিয়ার জন্য মুরগির মাংস তোলে, ‘‘শিয়া শিয়া, এ মুরগিটা খেয়ে দেখো তো, দারুণ মজা!’’
শু ঝি শিয়া প্লেট বাড়িয়ে ধরে, ‘‘ধন্যবাদ, শিয়াও শিয়াও দিদি।’’
‘‘আমার সঙ্গে এত ভদ্রতা কোরো না,’’ স্বাভাবিক সুরে উ শিয়াও শিয়াও আবার শাও ইয়োর প্লেটে মুরগির মাংস তোলে, ‘‘শাও ইয়ো, তুমিও খেয়ে দেখো!’’
‘‘ওহ~’’ লিয়ু চেং ছিন ঠাট্টা করে আওয়াজ তোলে, সবাই একটু হাসাহাসি করে।
শু ঝি শিয়া টেবিলের সকলের মুখ দেখে, তাদের মুখাবয়বে নানান ইঙ্গিতপূর্ণ ছায়া।
শু ঝি শিয়া বুঝে যায়।
হৃদয়ের ভার গলে ভেঙে যায়।
সব শুন্য লাগে।
শাও ইয়ো মুখ শক্ত করে, ‘‘খেতে খেতে তোমাদের কি মুখ থামানো যায় না?’’
উ শিয়াও শিয়াও পরিস্থিতি সামলাতে মুরগির মাংস লিয়ু চেং ছিন-এর প্লেটে দেয়, ‘‘ছিন দাদা, তুমিও মুরগিটা খাও!’’
লিয়ু চেং ছিন ঠাট্টার ছলে বলে, ‘‘আমি খাব না, আমার ভালো লাগে না।’’
উ শিয়াও শিয়াও বিষয় ঘোরায়, ‘‘শিয়া শিয়া, কেমন লাগল?’’
শু ঝি শিয়া ডাক পড়লে হাসিমুখে মাথা নাড়ে, ‘‘ভালো লাগছে।’’
শাও ইয়ো আবার শু ঝি শিয়ার প্লেটে মুরগির মাংস তোলে, সঙ্গে ঝাল লঙ্কা-খরগোশও দেয়।
এই গাড়ি সারাইয়ের দোকানে বড় গোল টেবিল।
প্রতিবার শু ঝি শিয়া খাবার খেলে শাও ইয়ো ওর প্লেটে তুলে দেয়।
সে ভাবে, যদি না দেয়, মেয়েটি না খেয়ে না মরে!
তাই শু ঝি শিয়া খেয়ালই করে না, ওর প্লেটে কী পড়েছে, তাই খেয়ে নেয়।
কিন্তু উ শিয়াও শিয়াও দেখতে পায়, শাও ইয়ো যেটা তার জন্য তুলেছিল, সেটা আবার শু ঝি শিয়ার প্লেটে দেয়।
উ শিয়াও শিয়াও মুখ ঘুরিয়ে স্বাভাবিকভাবে অন্যদের সঙ্গে কথা বলে।
আলোচনার মাঝে হঠাৎ কেউ বলে ওঠে, ‘‘শু ঝি শিয়া, তুমি কি চুল কেটে ফেলেছ?’’

প্রতি বারই শু ঝি শিয়া ব্যাপারটা ভুলতে চায়, আবার কেউ না কেউ মনে করিয়ে দেয়।
শু ঝি শিয়া মাথা নিচু করে মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে গলা ভেজা স্বরে বলে, ‘‘হ্যাঁ।’’
উ শিয়াও শিয়াও বলে, ‘‘খুব সুন্দর, খুব কিউট, তোমরা বলো তো?’’
কেউ একমত নয়, ঘুরিয়ে ঠাট্টা করে, ‘‘এমন করে চুল কেটে নাপিতকে কত টাকা দিয়েছ?’’
শু ঝি শিয়ার মাথায় আসে না, ভাবে তাকে চুল কাটাতে কত খরচ হয়েছে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, সে সরলভাবে বলে, ‘‘পনেরো টাকা।’’
সবাই হেসে ওঠে।
লিয়াও ঝি মিং বলে, ‘‘শু ঝি শিয়া, সে বলতে চেয়েছে, এমন চুল কাটার জন্য নাপিতকেই বরং তোমাকে টাকা দিতে হবে!’’
শু ঝি শিয়ার অনুভূতি প্রবল, সহানুভূতিশীলতাও বেশি, তাই খুব সংবেদনশীল।
এ মুহূর্তে সে জানে হাসির মধ্যে কোনো বিদ্বেষ নেই, তবুও লজ্জায় মুখ লাল হয়ে যায়।
কেননা, নিজেই ভাবে খুব বাজে দেখাচ্ছে।
বিপন্ন বোধ করে।
শাও ইয়ো হেসে বলে, ‘‘তোমার টাকা বেশ কাজে লেগেছে দেখি!’’
শু ঝি শিয়া পাশ ফিরল।
শাও ইয়ো ওর মাথায় আলতো চপেটাঘাত করে বলে, ‘‘পনেরো টাকায় দু'শো পঞ্চাশি কাটিং পেয়েছ!’’
দু'শো পঞ্চাশ...
শু ঝি শিয়ার মাথা গরম হয়ে যায়, অশান্তি আর ধরে রাখতে পারে না।
ওর কান্না পেতে থাকে।
কিন্তু পরিবেশ নষ্ট হবে ভেবে, প্লেট নামিয়ে বলে, ‘‘আমি খেয়ে নিয়েছি, তোমরা খাও।’’
বলেই দৌড়ে চলে যায়।
শাও ইয়ো ধরতে চায়, পারেনি।
উ শিয়াও শিয়াও শাও ইয়োর দিকে একবার তাকিয়ে সোজা হয়ে বসে বলে, ‘‘তোমরা দ্যাখো! একটা ছোট মেয়ে, সৌন্দর্য নিয়ে চিন্তিত, চুল খারাপ কাটার জন্য মন খারাপ, তোমরা সবাই মিলে হাসছো?’’
এবার সবাই দোষ ঘাড় থেকে নামাতে ব্যস্ত।
‘‘তুমি হাসলে, সব থেকে জোরে!’’
‘‘আমি তো চুপচাপ খাচ্ছিলাম, আমি না, তুমি!’’
‘‘না না, শাও ইয়ো বলেছে দু'শো পঞ্চাশ...’’
এদিকে ঝামেলার মাঝে শাও ইয়ো চুপচাপ চপস্টিকস নামিয়ে রেখে চলে যায় দোকানের পাশের কনভেনিয়েন্স স্টোরে।
স্বচ্ছ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে, দেখে শু ঝি শিয়া ক্যাশ কাউন্টারের পেছনে বসে আনমনা, ওকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে যায়, পিঠ দেখিয়ে বসে থাকে।
এ কেমন অভিমান?
কিন্তু ওর পিঠটা এতটাই চিকন, যেন ভেঙে যাবে।
শাও ইয়ো নরম স্বরে ডাকে, ‘‘শিয়া শিয়া, চলো, গিয়ে খাও।’’
শু ঝি শিয়া মাথা নাড়ে, ‘‘আমি পেট ভরে খেয়েছি!’’
‘‘শোনো।’’
‘‘আমি পেট ভরে খেয়েছি।’’
শাও ইয়ো সরাসরি বলে, ‘‘আর কেউ কিছু বলবে না, চলো খেয়ে নাও।’’
শু ঝি শিয়া একগুঁয়ে, ‘‘আমি পেট ভরে খেয়েছি!’’
শাও ইয়ো বিরক্তি চেপে ‘চッ’ শব্দ করে, গলা শক্ত করে, ‘‘তুমি কয়েকটা কামড়ই তো খেয়েছ!’’
শু ঝি শিয়া চুপ।
শাও ইয়ো এবার গম্ভীর গলায় সাবধান করে, ‘‘শু ঝি শিয়া!’’
উ শিয়াও শিয়াও এসে পড়ে, বাইরে থেকেই শাও ইয়োর গলা শোনে।
সে দোকানে ঢুকে শাও ইয়োকে বোঝায়, ‘‘শিয়া শিয়া এখনও ছোট, একটু বায়না করাই স্বাভাবিক, তুমি ওভাবে বকো না, একটু আদর করে বোঝাও!’’
শাও ইয়ো আপত্তি তোলে, ‘‘আর কত ছোট? এখনই তো বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে, তখন তো আর কেউ থাকবে না, কে আদর করবে? না খেয়ে অসুস্থ হলে তখন কার দোষ?’’
উ শিয়াও শিয়াও বলে, ‘‘বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেও, দাদার সামনে তো ছোটই থাকবে!’’

শাও ইয়ো বলে, ‘‘ছোট মেয়ে? আমার তো মনে হয়, একেবারে গুরুজন!’’
দুজনের একজন বোঝায়, একজন বকে, দুজনের কথাবার্তা শুনে...
তারা কি সত্যিই...
শু ঝি শিয়া চুপিচুপি কেঁদে ফেলে, চোখের জল গড়িয়ে পড়ে, কিন্তু মুখে হাত দেয় না, পাছে পেছনের কেউ দেখে ফেলে।
উ শিয়াও শিয়াও বলে, ‘‘তাহলে এভাবে করি, তুমি খেতে যাও, আমি শিয়া শিয়ার সঙ্গে কথা বলি।’’
শাও ইয়ো জানে, সে আদর করতে জানে না।
ভাবল, উ শিয়াও শিয়াও তো মেয়ে, হয়তো সহজে বোঝাতে পারবে।
সে ঘুরে চলে যায়।
শাও ইয়ো চলে গেলে, উ শিয়াও শিয়াও বলে, ‘‘শিয়া শিয়া, আর একটু খেয়ে নাও! এমন বায়না ভালো নয়!’’
শু ঝি শিয়া নিঃশ্বাস নিয়ে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে, ‘‘শিয়াও শিয়াও দিদি, তুমি যাও, আমি সত্যি পেট ভরে খেয়েছি।’’
উ শিয়াও শিয়াও এমনিতে ধৈর্যশীল নয়, তার ওপর এই এক মাসে শেষ সামান্য ধৈর্যও শাও ইয়োর কারণে ফুরিয়ে এসেছে।
শাও ইয়োর খুব রাগী স্বভাব, কোনো কথা একবারই বলে, না শুনলে মুখ গোমড়া, ভুল করলে সরাসরি ধমক দেয়।
গাড়ি সারাইয়ের দোকানে সবাইকেই সমান চোখে দেখে, মেয়েদেরও ছাড়ে না।
সেদিন সে কেবল গিয়ার চেক করতে ভুলে গিয়েছিল, তখনই বকা শুনতে হয়েছিল।
তবু এতে উ শিয়াও শিয়াও পিছিয়ে যায়নি, বরং শাও ইয়োর মতো কঠিন মানুষের কাছে জয় পাওয়ার ইচ্ছে আরও বেড়ে গেছে। সে চায়, একদিন শাও ইয়ো মাথা নত করবে তার সামনে।
উ শিয়াও শিয়াও নিজের সম্পর্কে বলে, সে খুব খোলামেলা, সরল, যা বলার তা বলে দেয়, কিন্তু শু ঝি শিয়া অতিরিক্ত সংবেদনশীল।
এমন মেয়েদের সে পছন্দ করে না।
আর বোঝে না, শাও ইয়োর মতো সোজা, রাগী ছেলে তাকে এত আদর করে কেন, জন্মদিনের জন্য এতো আয়োজন করে।
এমনকি গ্যারাজের অন্য পুরুষরাও শু ঝি শিয়ার প্রতি একটু আলাদা মনোভাব রাখে।
উ শিয়াও শিয়াও বলে, ‘‘শিয়া শিয়া, তুমি সত্যিই পেট ভরে খেয়েছ?’’
শু ঝি শিয়া মাথা নাড়ে।
উ শিয়াও শিয়াও আর কিছু বলে না, ‘‘তাহলে ঠিক আছে, তোমার দাদাকে আমি বলব।’’
শু ঝি শিয়া আঙুল চেপে ধরে, ‘‘ধন্যবাদ।’’
উ শিয়াও শিয়াও আবার টেবিলে ফিরে আসে।
শাও ইয়ো উ শিয়াও শিয়াও-এর পিছনে তাকিয়ে দেখে শু ঝি শিয়া আসে না।
শাও ইয়ো উঠে দাঁড়াতেই উ শিয়াও শিয়াও থামায়, ‘‘শাও ইয়ো, তুমি যেও না, তুমি মেয়েদের বুঝো না, গেলে ও আরও কষ্ট পাবে।’’
শাও ইয়ো আবার বসে পড়ে।
উ শিয়াও শিয়াও কড়া নজরে টেবিলজুড়ে তাকিয়ে বলে, ‘‘তোমরাও কেউ ওর কাছে যেও না, আরও মন খারাপ করবে, তোমাদের দেখলেই বিরক্ত লাগে।’’
সবাই হালকা গলায় বলে, ‘‘ঠিক আছে... ঠিক আছে...’’
উ শিয়াও শিয়াও-এর কথা শুনে শাও ইয়োর মনে অস্বস্তি লাগে।
শু ঝি শিয়া এতটাই শান্ত, কেমন করে ওর মুখে এসে একটু বদলে গেল?
কিন্তু নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারে না।
তবু শাও ইয়ো চিন্তায় থাকে শু ঝি শিয়া না খেয়ে আছে কিনা।
সে অনেকক্ষণ চুপ থেকে চপস্টিকস তুলে খাবার নিয়ে ওর কাছে যায়।
শু ঝি শিয়া ক্যাশ কাউন্টারের পেছনে বসে, তাকিয়ে দেখে কে এল, সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে।
আবারও অভিমান!
শাও ইয়ো প্লেট আর চপস্টিকস নামিয়ে রেখে গলা চেপে বলে, ‘‘গুরুজন, এবার খাও!’’
বলে, একবারও পেছনে না তাকিয়ে চলে যায়।